বহুল প্রচলিত রোগ জন্ডিস সম্পর্কে জানুন।

জন্ডিস (Jaundice) শব্দটি ফরাসি শব্দ যার অর্থ হলুদাভ। জন্ডিস আসলে কোন রোগ নয়, এটি একটি রোগের লক্ষণ মাত্র। রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে গেলে জন্ডিস দেখা দেয়। তাই ত্বক, চোখের সাদা অংশ এবং অন্যন্য মিউকাস ঝিল্লি হলুদ হয়ে যায়। (রক্তে বিলিরুবিনের ঘনত্ব 1.2 mg/dL বা 25 µmol/L এর নিচে থাকে)।

রক্তের লোহিত রক্ত কণিকাগুলো স্বাভাবিক নিয়মেই একটা সময় ভেঙ্গে গিয়ে বিলিরুবিন তৈরি করে যা পরবর্তী সময়ে লিভারে প্রক্রিয়াজাত হয়ে পিত্তরসের সাথে পিত্তনালীর সাহায্যে পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করে। বিলিরুবিন পিত্তরসের একটি উপাদান। জন্ডিস তিন প্রকারের:-

১) হিমোলাইটিক জন্ডিস ২) হেপাটোসেলুলার জন্ডিস ও ৩) অবস্ট্রাক্টিভ জন্ডিস।

কোন কারনে অপরিপক্ক বা পরিপক্ক লোহিত রক্ত কণিকা বেশি বেশি ভেঙ্গে গেলে যে জন্ডিস দেখা দেয় তাকে হিমোলাইটিক জন্ডিস বলে। থ্যালাসেমিয়া, ইমিউন হিমোলাইটিক এনেমিয়া, ইনফেকশন ছাড়াও অন্যান্য কারনে হিমোলাইটিক এনেমিয়া হতে পারে। এক্ষেত্রে একজন রক্তরোগ মেডিসিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হয়।

লিভারের সমস্যার কারনে যে জন্ডিস হয় তাকে হেপাটোসেলুলার জন্ডিস বলে। হেপাটাইটিস এ, ই, বি, সি ভাইরাস, নির্দিষ্ট কিছু ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, হোমিওপ্যাথি, কবিরাজী, আয়ুর্বেদ, ভেযজ ঔষধি, মদ ও নেশা জাতীয় দ্রব্য ছাড়াও অন্যান্য কারনে হেপাটোসেলুলার জন্ডিস হতে পারে। এক্ষেত্রে একজন গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিষ্ট বা লিভার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হয়।

লিভার থেকে পিত্তরস তৈরি হয়ে পিত্তথলিতে জমা থাকে এবং পরবর্তীতে পিত্তনালীর মাধ্যমে পৌষ্টিকতন্ত্রে যায় যা খাদ্য হজম করতে সাহায্য করে। পিত্তরসের এই বিলিরুবিন পায়খানার সাথে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। বিলিরুবিনের দীর্ঘ পথ পরিক্রমা স্বাভাবিকভাবে না হয়ে যে কোনো অসঙ্গতি দেখা দিলে রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে যায় এবং যে জন্ডিস দেখা দেয় তাকে অবস্ট্রাক্টিভ জন্ডিস বলে। পিত্তথলি, পিত্তনালী ও অগ্নাশয়ে পাথর, টিউমার ইত্যাদি কারনে এই জন্ডিস হয়। এক্ষেত্রে সার্জারি বিশেষজ্ঞের মতামত নিতে হয়।

জন্ডিসের লক্ষণ ও উপসর্গসমূহ:

১) চোখ ও প্রসাবের রং হলুদ হয়ে যাওয়া আবার সমস্যা বেশি হলে পুরো শরীর গাঢ় হলুদবর্ণ ধারণ করতে পারে। ২) শারীরিক দুর্বলতা। ৩) ক্ষুধামন্দা। ৪) জ্বর জ্বর অনুভূতি কিংবা কাঁপানি দিয়ে জ্বর আসা। ৫) বমি বমি ভাব অথবা বমি। ৬) মৃদু বা তীব্র পেট ব্যথা। ৭) অনেকসময় পায়খানা সাদা হয়ে যাওয়া। ৮) চুলকানি। ৯) লিভার বা যকৃত, প্লীহা বড় হয়ে যাওয়া।

কি কি পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে?

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তের সিবিসি, ডাইরেক্ট ও ইনডাইরেক্ট বিলিরুবিন, পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাফি ইত্যাদি পরীক্ষা করাতে হবে। আমাদের দেশে আখের রস জন্ডিসের একটি বহুল প্রচলিত ওষুধ। অথচ রাস্তার পাশের যে দূষিত পানিতে আখ ভিজিয়ে রাখা হয় সেই পানি মিশ্রিত আখের রস খেলে হেপাটাইটিস এ বা হেপাটাইটিস ই ভাইরাস মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পরতে পারে।

আমাদের দেশের একটি প্রচলিত বিশ্বাস হচ্ছে জন্ডিসের রোগীকে হলুদ দিয়ে রান্না করা তরকারি খাওয়ানো যাবে না কারন এতে রোগীর জন্ডিস আরও বাড়তে পারে। রক্তে বিলিরুবিন নামক একটি হলুদ পিগমেন্টের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারনেই জন্ডিস দেখা দেয়। এর সাথে হলুদের কোন সম্পর্ক নেই।

একইভাবে জন্ডিসের রোগীকে তেল-মসলা না দিয়ে শুধুমাত্র সিদ্ধ করা খাবার খেতে দেয়াও ঠিক নয়। এ সমস্ত রোগীদের এমনিতেই খাবারে অরুচি থাকে তার উপর এ ধরণের খাবার রোগীদের উপকারের চেয়ে অপকারই বেশী করে। তাই জন্ডিসের রোগীকে সব সময় এমন খাবার দেয়া উচিত যা তিনি খেতে পছন্দ করেন। তবে অবশ্যই বাইরের খাবার সব সময় পরিহার করতে হবে। বিশেষ করে পানির ক্ষেত্রে একটু বেশি সাবধানে থাকতে হবে । জন্ডিস থাক বা না থাক, কোনভাবেই না ফুটিয়ে পানি পান করা যাবে না। বাহিরে থেকে আনা ফুচকা, চটপটি, বোরহানি আর সালাদের ব্যাপারে খুব সাবধান থাকতে হবে।